শিক্ষা খাতে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে

শিক্ষা খাতে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ বেড়েছেঃ নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম মৌলিক উপাদান শিক্ষা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্প ‘দশটি বিশেষ উদ্যোগ’ এর মধ্যে শিক্ষা সহায়তা খাতে নারীর উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই খাতে বেড়েছে বরাদ্দ ও।  ২০২২-২৩ অর্থবছরের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন-এর ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি’ শীর্ষক বিষয়ভিত্তিক এরিয়ার বাজেট বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে। এই বরাদ্দ বৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৬০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং  ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে মানব উন্নয়ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং দক্ষতা উন্নয়নের সোপান হলো প্রাথমিক শিক্ষা। যা সকল শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। শিক্ষা ব্যক্তির দক্ষতা ও মননে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। একই সাথে ব্যক্তির কর্মের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।   গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেছেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এবং সিডো দলিলের ভিত্তিতে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১’ প্রণয়ন করা হয়েছে। মূলত: নারী উন্নয়নের লক্ষে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নীতি কৌশলের আলোকে এ নীতি প্রণীত হয়েছে। এ নীতির বাস্তবায়নকল্পে প্রণীত হয়েছে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩।

 

শিক্ষা খাতে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে

তিনি বলেন, উল্লেখিত নীতি ও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী নারীকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্যোগগুলো গ্রহণের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া রোধকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।  উদ্যোগ গুলো হলো- কন্যা শিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীকরণ এবং পরিবারসহ সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা; কন্যা শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন রাস্তাঘাটে কন্যা শিশুরা যেন কোনরূপ যৌন হয়রানি, পর্ণোগ্রাফী, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার না হয়, তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; কন্যা শিশুর জন্য নিরাপদ ও মানসম্পন্ন বিনোদন, খেলাধূলা ও সংস্কৃতি চর্চার সুবিধা নিশ্চিত করা;

প্রতিবন্ধী কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীকরণ এবং সকল ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; নারী শিক্ষা বৃদ্ধি, নারী পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হার ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা; শিক্ষা পাঠ্যক্রম ও বিভিন্ন পুস্তকাদিতে নারীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা, নারীর পুষ্টি বিষয়ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী যাতে তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রেখে বিকাশ লাভ করতে পারে সে লক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা; যে সব নারী অনিবার্য কারণে শিক্ষার মূল ধারায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারবে না শুধু সে সব নারীর জন্য বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থা বিবেচনা করা; প্রতিবন্ধী নারীর শিক্ষাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীতার ভিন্নতার প্রতি গুরুত্বারোপ করা।

 

শিক্ষা খাতে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে

জেন্ডার ভিত্তিক বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা স্তরের পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগেও নারী শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একটি নির্দিষ্ট বয়সের কর্মক্ষম জনসাধারণকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১- এ বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় সাফল্য অর্জন করেছে। মাধ্যমিক স্তরে এ দেশে ভর্তির হার ৬১ দশমিক ২৭ ভাগ । আর মাধ্যমিক স্তরে ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত ৪৫.২ : ৫৪.৮। শিক্ষা সম্প্রসারণে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ-উন্নয়ন, ছাত্র ও শিক্ষকদের বৃত্তি-উপবৃত্তিসহ আর্থিক সহায়তা, মেধার বিকাশে অন্যান্য নানারূপ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে।

 

শিক্ষা খাতে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে

২০২২-২৩ সালের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষা খাতের সার্বিক মান উন্নয়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে এ বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ প্রদান অব্যাহত রেখেছে। যা ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট জিডিপি’র শতকরা হারে প্রায় ১.০৩%। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে মোট বাজেটের শতকরা হারে এ বিভাগের বাজেট প্রায় ৫.৬৬%।  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ ও ১৭ অনুচ্ছেদে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষা সেবা প্রদানে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার প্রতিপালনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রাথমিক শিক্ষা পরবর্তী শিক্ষা হতে শুরু করে শিক্ষার উচ্চস্তর পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও নীতিকৌশল প্রণয়ন করে থাকে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে নারী শিক্ষার নীতি কৌশল হিসেবে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ কে অনুসরণ করা হয়। এতে বলা হয়েছে- নারী শিক্ষা বৃদ্ধি, নারী পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হার ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা এবং উন্নয়নের মূল ধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষে শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসরণ করা হবে। নারীর নিরক্ষরতা দূর করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে- বিশেষত: কন্যা শিশু ও নারী সমাজকে কারিগরি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সকল বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। এ ছাড়াও কন্যা শিশুদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষে উপবৃত্তি প্রদান অব্যাহত রাখতে এবং মেয়েদের জন্য ¯œাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

 

শিক্ষা খাতে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে

দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী  নারী শিক্ষা ও দক্ষতার মানোন্নয়নে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত ম্যান্ডেট গ্রহণ করেছে। ম্যান্ডেটগুলো হলো-নারী ও পুরুষের জন্য সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা; পেশাগত ডিগ্রি কোর্সে নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা; গবেষণা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; নারীদের যোগ্যতাভিত্তিক প্রতিনিধিত্বকরণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা; বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স তৈরি; বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিবন্ধন ও নিয়োগ; মেধাবৃত্তিসহ মাধ্যমিক ও ¯œাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ,

মাল্টিমিডিয়া বই, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় তথ্য- প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ; এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।  ২০২২-২৩ অর্থবছরের জেন্ডার বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেখ হাসিনার বিশেষ দশ উদ্যোগের মধ্যে ‘শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি’র একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে নারীর দক্ষতা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন। যা নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আরও দেখুনঃ